‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ইসলাম কায়েম’ ইস্যুতে ইমাম আনোয়ার আল আওলাকি যা বললেন (KaizenSeries : 8)

গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিবর্তনের প্রবক্তারা এই কথা বলে শুরু করেন যে, গণতন্ত্র কুফর এবং আমরা এতে বিশ্বাস করি না, কিন্তু আমরা এটিকে ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করছি এবং আমরা ক্ষমতায় যাওয়ার পর ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবো। এ কথাই আমি শুনছি ৮০’র শেষ ও ৯০’র শুরু পর্যন্ত ইখওয়ানের প্রত্যেক নেতৃস্থানীয় সদস্য থেকে। আমার পরিষ্কার মনে আছে সেই গণ-আলোচনার কথা যা ঘটেছিল এই বিষয়ের উপর, কারণ তখন সালাফীরা এই পয়েন্টে ইখওয়ানের ঘোর বিরোধী ছিল। আমার এও স্পষ্ট মনে আছে ইখওয়ানের কয়েকজন শাইখের সাথে আমার সেই একান্ত আলোচনার কথা যেখানে তাঁরা বারংবার বলছিলেনঃ গণতন্ত্র অনৈসলামীক এবং আমরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এর (অর্থাৎ গণতন্ত্রের) মধ্যে থেকে সিস্টেমের পরিবর্তন করা।

এই পদ্ধতির মধ্যে তিনটি সমস্যা আছেঃ

প্রথমতঃ গণতন্ত্রকে ব্যবহার করা এবং গণতান্ত্রিক সিস্টেমের অনুগামী বলে দাবী করা কিন্তু তাতে বিশ্বাস না রাখা –

এটি একটি প্রতারণা ও মিথ্যাচার। এখন শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতারণা গ্রহণযোগ্য, যদি মুসলমানরা তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকে। সমস্যাটা হল, এই বিশেষ দলগুলো যারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত; বিশ্বাস করে না যে তারা কাফেরদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত আছে, বরং বিশ্বাস করে যে, মুসলমান ও কাফেরদের মাঝে চুক্তি আছে। সুতরাং যদি আমরা কাফেরদের সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকি তাহলে তাদের (কাফেরদের) সাথে প্রতারণা করা গ্রহণযোগ্য নয় এবং মিথ্যা বলাও গ্রহণযোগ্য নয়। এটাই হচ্ছে প্রথম সমস্যা।

পরবর্তী সমস্যা হল, আপনি যখন একটি মিথ্যাকে যথেষ্ট পরিমাণ দীর্ঘ সময় ধরে পুনরাবৃত্তি করবেন তখন শেষ পর্যন্ত আপনি তাই বিশ্বাস করবেন।

যারা এইসব দলগুলোকে ৮০’র দশক থেকে দেখেছিলেন, সময়ের সাথে এইসব দলগুলোর যে কি পরিমাণ পরিবর্তন ঘটেছে তা দেখে তাদের কাছে এটা বিস্ময়কর লাগে। এখন তারা বলছে এবং আমিও তাদের বিশিষ্ট সদস্যদের কাছ থেকে বহুবার শুনেছি যে, “এখন আমরা আসলেই গণতান্ত্রিক সিস্টেমে বিশ্বাস করি। আমরা বুলেট নয় ব্যালটে বিশ্বাস করি। এবং যদি ব্যালট একটি ধর্মনিরপেক্ষ অথবা কাফের দলকে জয়ী করে তাহলে আমরা তাই গ্রহণ করবো!!”

মুসলমান হিসাবে আমাদের ইসলামকে মানুষের খামখেয়ালীর বিষয় বানানো উচিত না যে, যদি তারা এটি (অর্থাৎ  ইসলাম /ইসলামী শরীয়াহ) বেছে নেয় আমরা তা বাস্তবায়ন করব, আর যদি তা না করে তবে আমরা জনসাধারণের পছন্দ মেনে নিব। আমাদের অবস্থান এই যে, আমরা পৃথিবীতে তলোয়ারের ডগা দিয়ে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করব; জনসাধারণ এটি পছন্দ করুক বা না করুক। আমরা শরীয়াহ শাসনকে জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতার বিষয় বানাবো না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-

আমাকে তলোয়ার সমেত পাঠানো হয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত না একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার উপাসনা করা হয়।” (মুসনাদে আহমাদ)

এই পথই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পথ, যে পথ আমাদের অনুসরণ করা উচিত।

চূড়ান্ত সমস্যা হল, মুসলমানদের প্রক্রিয়া, অনুপ্রবেশের প্রক্রিয়া নয়।

মুসলমানরা ওই(গণতন্ত্র) সিস্টেমে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে না এবং তার মধ্যে থেকে কাজও করে না। এটি আমাদের পথ না। এটি ইহুদী ও মোনাফেকদের পথ, কিন্তু মুসলমানদের পথ না। আমরা বন্ধু ও শত্রুর সাথে সৎ ও অকপট(বা অক্রূর)। আমরা আমাদের উদ্দেশ্য উন্মুক্ত রাখি এবং আমরা প্রকাশ্যে আমাদের দাওয়াহ ঘোষনা করি, “তোমার জন্য তোমার দ্বীন আর আমার জন্য আমার দ্বীন।” আমরা এই(গণতান্ত্রিক) সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করতে চাই না, হোক তা আমেরিকায় অথবা কোন একটি মুসলিম দেশে। ইহুদীরাই একমাত্র সকল সরকার ব্যবস্থায়(যার অধীনেই তারা ছিল) অনুপ্রবেশ করেছে, হোক তা আল-আন্দালুস (ইসলামিক স্পেন) ও ওসমানীয় খিলাফা অথবা আজকের পশ্চিমা সরকারসমূহ। তাদের(ইহুদীদের) গোপন এজেন্ডা আছে, আমাদের (মুসলমানদের) নাই।

ইহুদী ও তাদের দোসর মোনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সরকার ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করেছিল এবং কুরআন দ্বারা তাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছিল-

“এবং এক দল কিতাবধারী (একে অপরকে) বলাবলি করছিল, মুমিনদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, দিনের শুরুতে তা বিশ্বাস কর আর দিনের শেষে তা অস্বীকার (বা পরিত্যাগ) কর, যাতে তারা(অর্থাৎ মুমিনরা) ফিরে যায় (অর্থাৎ, তাদের ধর্ম পরিত্যাগ করে)।”

সুতরাং তাদের পরিকল্পনা ছিল যে, তারা মুমিনে পরিণত হবে এবং মুসলিমদের মাঝে আসবে, শুধুমাত্র দিন শেষে তা পরিত্যাগ করার জন্য। আল্লাহ মোনাফেকদের বিষয়েও বলেছেন যে, তাদের পরিকল্পনা ছিল যে, তারা মুমিনদের সাথে বসবে এবং যা শুনবে তা ইহুদীদের নিকট পৌছে দেবে। সুতরাং, যারা বলে আমাদের এই (গণতান্ত্রিক) সিস্টেমের সাথে থেকে এটিকে পরিবর্তন করা উচিত তারা মুসলমানদের পথ অনুসরণ করছে না এবং যদি চারিত্রিকভাবে তারা মুসলিম হয়ে থাকে, তবে তারা ব্যর্থ হবে। কারণ অনুপ্রবেশ মুসলিম আচরণের সাথে খাপ খায় না। কিন্তু যদি তারা এই(গণতান্ত্রিক) সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম (বা সফল) হয়, তাহলে তা প্রমান করে যে, তাদের চরিত্র ইহুদী বা মোনাফেকদের চরিত্রে পরিনত হয়েছে, মুসলমানদের চরিত্রে নয়।

একটি বিষয় এর সাথে সম্পর্কিত আর তা হচ্ছে, যারা ইসলামী পরিবেশ থেকে উঠে এসেছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে বর্তমান রাজনৈতিক সিস্টেমের মধ্যে কাজ করেছে তারা শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদে পরিণত হয়েছে, যাদের প্রক্রিয়ায় রয়েছে কূটনৈতিক, রঙ-বদল, বস্তুবাদী ও কৌশলী ইত্যাদি শব্দের সকল নেতিবাচক অর্থসমূহ। তারা হয়তো ইসলামী আন্দোলনের শক্ত তারবিয়াহ কর্মসূচির মধ্যে পালিত হয়েছিল, কিন্তু কিছুদিন পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তারাই নেকড়েতে পরিণত হয়েছে, যাকে তারা পরিবর্তন করতে চেয়েছিল।

আমি এইসব আমার নিজ চোখেই দেখেছি যা আমার পরিচিত মানুষদের ক্ষেত্রে ঘটেছে এবং ইয়েমেন ভিত্তিক ইসলামী আন্দোলনের এক নেতা বলেছেনঃ “আমরা তাদেরকে ভেড়া হিসাবে নেকড়েদের জগতে পাঠাই একটি কঙ্কাল সাবাড় হিসাবে ফেরত পেতে।” আপনি যদি জীবন্ত উদাহরণ চান; এটি দেখতে যে, সিস্টেমের (গণতান্ত্রিক সিস্টেমের) মধ্যে থেকে কাজ করলে তার ফলাফল কি হয়, তাহলে সুদান ও তুর্কির চেয়ে বেশী দূর তাকানোর দরকার নেই। দুই দেশেরই ক্ষমতাসীন দলগুলো ইসলামীক আন্দোলন দিয়ে শুরু করে শেষ পর্যন্ত অন্য সবার মতো পঁচা ও দূষিত পরিবেশে গিয়ে শেষ হয়েছে।

[ ইমাম আনোয়ার আওলাকিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি সম্পর্কে, উত্তরে শাইখ প্রস্তাবিত ৪ টি পদ্ধতি (দাওয়াহ, গণতন্ত্র, নুসরাহ, জিহাদ) নিয়েই আলোচনা রাখেন। আমি এখানে শুধু গণতন্ত্র সম্পর্কে শাইখের বক্তব্য তুলে ধরেছি। শাইখের পুরো উত্তরটি দেখুন এখানে- http://goo.gl/vUdmLp ]

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s